ক্ষমতার সুষম সম্পর্কই নারী নির্যাতন বন্ধ করতে পারে


সম্পদে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা না পেলে নারীর প্রতি সহিংসতা কখনই বন্ধ হবে না। মূলত সম্পদ দিয়েই ব্যক্তি তার শক্তির প্রকাশ ঘটায়। আর এ সম্পদে পুরুষ একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। আধিপত্য বিস্তারের উৎস পরিবারই। পরিবার থেকেই একজন নারী বঞ্চনার শিকার হতে শুরু করেন।

নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘জাগো নিউজ’র বিশেষ আলোচনায় যুক্ত হয়ে আলোচকরা এমন মন্তব্য করেন। দিবসটি উপলক্ষে জাগো নিউজের সহকারী সম্পাদক ড. হারুন রশীদের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন উপ-সচিব ও মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. শেখ মুসলিমা মুন এবং লেখক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার মিতি সানজানা।

ড. শেখ মুসলিমা মুন তার আলোচনায় বলেন, পৃথিবীর অর্ধেক নারী। অর্ধেক মানুষকে আড়ালে রেখে সভ্যতা এগোতে পারে না। নারী সব অর্থেই শক্তির জোগান দেন। বঞ্চনা বা নির্যাতন নয়, নারীর শক্তির জায়গা আরও শক্ত করতে পারলেই মানুষের সত্যিকার মুক্তি আসবে।

বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান ৫০তম উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই চিত্র এক অর্থে ইতিবাচক বটে। তবে নারী বৈষম্যের শিকার গোটা বিশ্বেই। বাংলাদেশে গোটা সম্পদের নারীর অধিকার রয়েছে শতকরা মাত্র ৪ ভাগ। আর পুরুষের ৯৬ ভাগ। বিশ্বে সম্পদে নারীর মাত্র ১ ভাগ মালিকানা রয়েছে। সভ্যতার এমন সময়ে এই চিত্র অবশ্যই হতাশ করে। সম্পদের ওপর নারীর মালিকানা বৃদ্ধি না পেলে নির্যাতন-সহিংসতা বন্ধ হবে না।

ব্যারিস্টার মিতি সানজানাও ঠিক এমনটিই মনে করেন। নারী নির্যাতন রোধে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সিডো কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। গত ১৫ বছরে দেশে বহু আইন তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু পরিবর্তন আসলে কতটুকু হলো, তা দেখার বিষয়। আর্থিক থেকে শুরু করে মানসিকসহ সব জায়গায়ই নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অর্থাৎ এত কিছুর পরেও আমরা নারী নির্যাতন বন্ধ করতে পারিনি। আইন করলেই সব সমাধান হয় না। যদিও আমাদের বিচার ব্যবস্থার মধ্যে ত্রুটি আছে।

নারীর ক্ষমতায়নে অর্থনৈতিক মূল্যায়নে জোর দেওয়ার তাগিদ জানিয়ে ড. শেখ মুসলিমা মুন বলেন, নারীর কাজের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করতে না পারলে তাকে সব জায়গায় ঠকতে হয়। মাতৃতান্ত্রিক সমাজে পরিবারে নারীই ছিলেন সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে। কৃষিনির্ভর সমাজেও ঠিক তাই ছিল। সময়ের বিবর্তনে পুরুষ যখন সম্পদের একক মালিক হতে থাকলো, ঠিক তখনই পুরুষের সিদ্ধান্ত একমাত্র বিবেচ্য হতে থাকলো। আর সিদ্ধান্ত যখন চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন দুর্বল পক্ষ স্বাভাবিক কারণেই বৈষম্যের শিকার হয়। মূলত ক্ষমতার সুষম সম্পর্কই নারী নির্যাতন বন্ধ করতে পারে।

উত্তরাধিকার আইনের কথা উল্লেখ করে ব্যারিস্টার সানজানা বলেন, এ আইনে একজন নারী পরিবার থেকে একজন পুরুষের অর্ধেক সম্পত্তি পাওয়ার কথা। পারিবারিক মুসলিম আইন এটিই সংরক্ষণ করে। অথচ সেটিও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। অর্থাৎ সম্পদে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা পাক, এটি আইনে থাকলেও বাস্তবে কোনো রূপ নেই। এ কারণেই নির্যাতনের মাত্রা বাড়ছে।

পরিবার থেকে স্বশিক্ষিত বা সুশিক্ষিত করে না তুলতে পারলে আসলে আইন করে কোনো লাভ হবে না। গরিব ঘরে একজন নারী যেমন নির্যাতনের শিকার হন, তেমনি বিত্তশালীর ঘরেও একজন নারী নির্যাতনের শিকার হন। হয়তো নির্যাতনের ধরন আলাদা। নারীকে মানুষ হিসেবে না দেখে যখন শুধু নারী হিসেবেই দেখা হয়, তখন সব পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি একই থেকে যায়। এ কারণে আমি মনে করি নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সবার আগে পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে। সমতার শুরুটা হতে হবে নিজের ঘর থেকেই।

শিক্ষা, সংস্কৃতির সঠিক বিকাশ না ঘটলে নারীকে আড়ালেই থাকতে হবে উল্লেখ করে মুসলিমা মুন বলেন, একজন সন্তান তার মায়ের গর্ভ থেকেই সমাজ, ব্যক্তির মধ্যকার চিত্র অনুধাবন করতে থাকে। জন্মের পর কথা না বললেও দেখতে পারে। এরপর তাকে এ সমাজের মধ্য থেকেই বেড়ে উঠতে হয়। পরিবার, সমাজ থেকে সে যা পায়, তা জীবনের অংশ হিসেবে প্রতিফলন ঘটায়। এ কারণে পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো খুব জরুরি বলে মনে করি।

এএসএস/এআরএ/জেআইএম



Source link

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *