হাসান আজিজুল হকের শেষ গল্প


পাড়াগাঁয়ের সাধারণ মানুষ। কানে তার একটা বিড়ি গোঁজা থাকারই কথা। এর কানে রয়েছে পেনসিল। বোঝা যায়, পেনসিলটার ব্যবহার হয়। সে নিরক্ষর মানুষ। পেনসিল নিয়ে কী করবে! অথচ কাগজ-পেনসিল ছাড়া তার চলে না। রুল টানা নয়, একটা সাদা খাতা সব সময় তার সঙ্গেই আছে। গৌরবর্ণ সুপুরুষ মানুষটি মাথাভরা টাক, ঘাড়ের ওপর সামান্য কিছু কাঁচা-পাকা চুল, দাড়ি-গোঁফ কামানো। রেশনের দোকানে একমুঠো চিনি খেতে চেয়েছিল বলে গাঁয়ের সেরাজুল কিছু অ্যামোনিয়া সার তার মাথায় দিয়ে দিয়েছিল। মানুষটি ভেবেছিল, চিনিই যখন, তখন টাক মাথায় কেন। মাথায় হাত বুলিয়ে হাতটা মুখে দিয়ে দেখে বিচ্ছিরি নোনতা। এতেও কিন্তু সে রাগ করে না। চোখ কুঁচকে হাসে।

আজকের এই পড়ন্ত বিকেলে সে বলছে, ‘তুমি তো বড় ভাবনায় ফেলে দিলে পণ্ডিত। মাটির বাড়িই তো বানাবে, তাতে এত কথার কী আছে? এই যে খাতা এনেছি, তুমি যেমন চাও বলো, আমি খাতায় এঁকে দিচ্ছি।’

না, না, ওভাবে হবে না হানিফ। আমি একদম আলাদা একটা বাড়ি বানাব।

তা বানাও না। ঘর বেশি চাই? বলো, কটা ঘর চাই? পাশাপাশি পাঁচটা ঘর বানিয়ে দিচ্ছি।

আরে না। মাটির বাড়িই করব বটে, তা এমন বাড়ি, যা এ তল্লাটে আর একটাও নেই।

কোঠাবাড়ি বলছ?

দূর, দোতলা কোঠাবাড়ি তো হবেই। তিনতলা করব আমি।

কী যে বলো পণ্ডিত! তিনতলা মাটির বাড়ি? এখানে কেউ এ রকম করেছে নাকি?

করে নাই বলেই তো করে দেখিয়ে দেব।

তোমার ওই পাঁচিল ঘেরা জায়গাটা ক’ কাঠা? পুরো সাড়ে ছয় কাঠা। বিনোদবাবুর কাছ থেকে যখন কিনি, তিনি নিজে মেপে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। দুটো ঘর ওখানে আগে থেকেই ছিল। এখন নেই, ভেঙে দিয়েছি। এখন সাড়ে ছ’ কাঠাই একেবারে সমান। কোথাও একটুও টইটক্কর নেই। দুই কোণে দুটো ডুমুর গাছ, পুবের দেয়াল ঘেঁষে একটা পেয়ারাগাছ ছাড়া আর কিছুই নেই এখন।

তা যত বড় বাড়িই করো, অত জায়গা তো লাগবে না।

বাড়ি বাদ দিয়ে সবটাই ফাঁকা উঠোন হবে। এখন সেখানে দূর্বাঘাস, কাঁটালতা, নটেশাক—এই সব আছে। বাড়ি করার জন্যে একেবারে তৈরি জমি।

এখন বলো পণ্ডিত, কেমন বাড়ির কথা ভাবছ তুমি? ইট-বালি-সিমেন্টের বাড়ি নয়, মাটিরই বাড়ি? তুমি হচ্ছো দশ গাঁয়ের মাথা, তোমাকে ভয়ও করি, মান্যও করি। তুমি একটা কথা বললে অমান্যি করার ক্ষ্যামতা নাই কারও।

হানিফ, তুমিও সামান্য লোক নও। তুমি হচ্ছো কারিগর। এলেবেলে ঘরামি নও। দালানকোঠা তো তুচ্ছু কথা, তার কত মিস্ত্রি আছে, লেখাজোখা নেই। তোমার মতো মাটির কারিগর কি আর আছে? তোমার তৈরি মাটির বাড়িও এক শ বছর টিকবে।

তা আমাদের এই এলাকায় মাটিটা ভালো বটে। সব রকমই পাওয়া যায়। দেয়াল করার জন্যে এঁটেল মাটি তো আছেই, একটু দেখেশুনে আনলে বেলে মাটিও মেলে। লাল মাটিটাই এদিকে নাই। তবে তার দরকারই বা পড়ছে কেন? ঘরের ভেতরে দেয়াল পলেস্তারা করার জন্যে ওই এঁটেল মাটির সঙ্গে বেনাঘাস মিশিয়ে নিলেই তো হলো। লাল মাটির কোনো দরকারই নেই। এঁটেল মাটির দেয়াল ইট-সুড়কির গাঁথনির চেয়েও ভালো।

ঘরের ভেতরের দিকের দেয়ালে বেলে মাটির পলেস্তারা হবে। মওলা বখশ খুব সময় নেয় বটে, কিন্তু কাজ করে নিখুঁত। দালানবাড়ির বালি-সিমেন্টের পলেস্তারার চেয়েও ওর বেলে মাটির পলেস্তারা ভালো। মিস্ত্রিখরচ একটু বেশি লাগবে, এই যা। তা জীবনে এমন বাড়ি তো একবারই করব!

তা পণ্ডিত, একটা কথা শুধুই! রাগ করবে না তো?

না, না, বলো, রাগ করব কেন?



Source link

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *